স্বাস্থ্যের ডিজি ও তার শক্তি রহস্য

বুধবার, জুলাই ২২, ২০২০ ৫:৩৩ অপরাহ্ণ

অবশেষে ‘মিসাইল’এর খোঁজ মিলেছে, যাদের ক্ষমতায় বলিয়ান হয়ে অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, মিঠু, সাহেদ, শামীম গংরা উন্নয়নের বুলেট ট্রেনে চাপা দেশটাকে গভীর সংকটের গিরিখাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে; করোনায় বা তার পূর্ববর্তী সময়ে হাজার হাজার মানুষ বিনা চিকিৎসায় বা অপ-চিকিৎসায় মারা গেছেন আমাদের দেশে।

এ দেশ তৈরি হয়েছে লুটপাট ও অর্থ পাচারের ভার্জিন ফিল্ড। দুর্নীতিবাজ, নারী সম্ভোগকারী, টাকা পাচারকারীরা পেয়েছে পরোক্ষ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা। জেলের আসামীকেও জেলে যেতে হয়নি বরং উচ্চ-মহলের মদদে মহা-দাপটে করেছে সদম্ভ পদচারণা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনায়। দুদুককে দেখিয়েছে বৃদ্ধাঙ্গুলি। এর আগে আসুন একটু দেখে নিই আমলাতন্ত্র কী।

আমলাতন্ত্র এমন এক শাসনব্যবস্থা যাতে স্থায়ী সরকারি কর্মকর্তারা দায়িত্ব বিভাজনের মাধ্যমে সরকারের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। আমলারা জনপ্রতিনিধি বা ভোটের নির্বাচিত নয়, ফলে রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তিত হলেও আমলারা পদ হারান না। এই চারিত্র্যের কারণে আমলাতন্ত্রে সরকার পরিচালনার ধারাবাহিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত হয়। আমলারা হচ্ছেন সরকারের অনির্বাচিত অংশ যারা যাদের নীতিনির্ধারণ তৈরিকারক হিসেবেও আখ্যা দেয়া হয়। তারা সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন।

আমলাতন্ত্রের ইংরেজি প্রতিশব্দ বুরোক্রেসি। ১৮১৮ সালে প্রথম ইংরেজি ভাষাতে বুরোক্রেসি শব্দের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।

আমলাতন্ত্র যে কোন দেশের জন্য অপরিহার্য হলেও, আমলাদের সিনিয়রদের মধ্যে কেউ কেউ যদি অসৎ হয় তাহলে তিনি পুরো দেশের অর্থনীতি, সামাজিক অবস্থার বারোটা বাজিয়ে দিতে পারেন। পক্ষান্তরে সুস্থ আমলাতন্ত্র দেশকে সার্বিকভাবে স্থিতিশীল রাখে। সুস্থ আমলাতন্ত্রের উদাহরণ হিসেবে আমরা জাপানের নাম উল্লেখ করতে পারি।

বিভিন্ন মাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, আমাদের দেশের ক্যাসিনো কেলেংকারি থেকে আরম্ভ করে সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য খাতের কেলেকারির মূলে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন আমাদের দেশের একজন মহা পরাক্রমশালী সিনিয়র সচিব। যিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বসেই সমস্ত কলকাঠি নাড়তেন। কামিনী, কাঞ্চন আর পাগলা পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে তিনি তাঁর নামের নাম স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের একজনকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি হিসেবে নিয়োগ দেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বাইপাস করে তিনি ডিজি ডা. আবুল কালাম আজাদের চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগের ব্যবস্থা করেন তাঁর পদের প্রভাব খাটিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে।

১ ডিসেম্বর ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অবসর নেওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি ছিলে স্বাস্থ্য সহ অন্যান্য দপ্তরের লুটপাট ও টাকা পাচারের অন্যতম কারিগর। তাঁর সহযোগীদের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ছিল ঠিকাদার মিঠু গং যাদের দায়িত্ব ছিল স্বাস্থ্য খাতে লুটপাট করে টাকার যোগান দেওয়া। তাঁর প্রভাবেই মিঠু দুর্নীতিবাজ হয়েও দুদুক থেকে ভালো মানুষের সার্টিফিকেট পান।

পাপিয়ার স্থলাভিষিক্ত সাহেদ, সাবরিনাদের মাধ্যমে টাকা আর নিত্য নতুন সুন্দরী নারী ও পাগলা পানির নিবিবিচ্ছিন্ন সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধান করা হতো। তাঁর কারণেই সাহেদের মত বিশ্ব বাটপার জেলের পরোয়ানা মাথায় নিয়েও রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন মন্ত্রীদের কাছে যাবার সুযোগ পেতেন। তার টিমের অধিকাংশই ছিল স্বাধীনতা বিরোধীদের পরিবার থেকে উঠে আসা, আর দুই এক জন ছিল খন্দকার মোস্তাকের মত নিমক হারামের পরিবারের সদস্য। এর আগে ক্যাসিনো কেলেংকারির নায়কেরা তাঁর সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গোয়েন্দা সংস্থার জমা দেওয়া সমস্ত দুর্নীতির রিপোর্ট গায়েব হয়ে যেতো বলেই প্রধানমন্ত্রী এই খবর পেতেন না।

একটি সূত্র দাবি করেন যে, প্রধানমন্ত্রী গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের বলেন যে তারা বঙ্গবন্ধুর খুনের আগাম বার্তা দিতে পারেন, জিয়ার খুনের আগাম বার্তা দিতে পারেন, কিন্তু কাসিনো কেলেংকারি মত এতো বড় ঘটনার খবর কেন জানান নি। তখন গোয়েন্দা সংস্থার থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তাঁদের জমা দেওয়া প্রতিবেদনের রিসিভ কপি দেখানো হয়। এখানেও সেই একই সিনিয়র আমলার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় নি এই কারণে যে, তিনি তাঁর প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনের আমলা অংশে এমন সব গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁর তাবেদার লোক বসিয়েছেন যে তাতে হাত দিলে পুরো দেখ নড়বড়ে হয়ে যাবে, উন্নয়ন ব্যাহত হবে।

করোনা মোকাবিলায় সীমাহীন ব্যর্থতা, সীমিত পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলা, সিন্ডিকেটদের তল্পিবাহক এবং সিন্ডিকেটদের নিয়ে অধিদপ্তর পরিচালনা করা, জেকেজি কেলেঙ্কারি, রিজেন্ট কেলেঙ্কারি, মাস্ক কেলেঙ্কারি, বিশ্বব্যাংক এবং এডিবি প্রকল্পের দুর্নীতি, রিজেন্টকে যন্ত্রপাতি প্রদান, মন্ত্রণালয়কে অসহযোগিতা করা, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ ইত্যাদি গোয়েন্দাদের জেরায় নানা অপকর্মের প্রকাশ পেলেও তাঁর দায়ভার সরকারের উপর বর্তায়। প্রধানমন্ত্রীর শূন্য সহিষ্ণুতার ফলে পাগলা পানি, কামিনী আর কাঞ্চনের নেশায় যারা অজ্ঞান ছিলেন তাঁরাও আস্তে আস্তে চিহ্নিত হচ্ছেন, ধরা খাচ্ছেন।

এতে দেশে বিদেশে বসে মিঠু ও তারেক জিয়া গংদের টাকায় আর বিদেশি নেত্র নিউজ নামের একটা অনলাইন পোর্টালে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের উপর সব দোষ চাপিয়ে সাহেদ, সাবরিনা, মিঠু গং আর তাদের অন্যতম গুরু ডিজি হেলথ অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদকে রক্ষায় আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন বিজাতি (বিএনপি, জামাতি) ও বামাতিরা। ইদানীং তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা খুব সক্রিয়।

বিসিএস ’৮১ ব্যাচের এই সিনিয়র কর্মকর্তা তাঁর আমলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু বাছাই করা মানুষকে সুবিধা দিয়েছেন, যারা তাঁর কথায় উঠবে বসবে, কিংবা খন্দকার মোস্তাক টাইপের লোক যাদের পাগলা পানি, কামিনী আর কাঞ্চনের লোভ আছে। এ সব সুবিধা পাওয়া কর্তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন উপায়ে প্রভাব খাটিয়ে সাহেদ, সাবরিনা, মিঠু গং আর তাঁদের অন্যতম গুরু ডিজি হেলথ অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদকে রক্ষায় আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শূন্য সহিষ্ণু নীতিতে সিএমএসডি’র প্রধান, স্বাস্থ্য সচিব পরিবর্তন হয়, দেরিতে হলেও সাবরিনা, সাহেদ গ্রেফতার হলে গোয়েন্দারা সব খবর পেয়ে যান। এসব তথ্য প্রধানমন্ত্রীর গোচরে এলে ঐ সাবেক সচিব হাল ছেড়ে দেন। এমতাবস্থায় অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ পদত্যাগে বাধ্য হন।

১৪ জুন প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকনের বরাতে এখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই উল্লেখ্য করা যায় যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্যসচিব, এসডিজি’র সাবেক মুখ্য সমন্বয়কারী আবুল কালাম আজাদ জাতিসংঘের ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ)-এর বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। banglainsider