‘সুমন, আমি জে’কেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা বলছি, তুমি খুব কি’উট…’

মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২০ ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ

আমি জে’কেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা বলছি-‘সুমন আমি জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা বলছি। তুমি খুব কিউট। আমার প্র’তিনিধি পাঠাচ্ছি। করোনা নমুনা সংগ্রহ করতে সব ধরনের সহযোগিতা কর।’ সরকারের কাছ থেতে বিনা মূল্যে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি নিয়ে বুকিং বিডি ও

হেলথকেয়ার নামে দুটি সাইটের মাধ্যমে টাকা নেওয়া এবং নমুনা পরীক্ষা ছাড়াই ভু’য়া সনদ জালিয়াতি করার অ’ভিযোগে গ্রে’প্তার জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান ও জাতীয় হৃদেরাগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. সাবরিনা চৌধুরীর মোবাইল ফোন চেক করে এ ধরনের অনেক মেসেজ পেয়েছে পু’লিশ।

প্রতিটি মেসেজের শুরুতেই সাবরিনা নিজেকে জেকেজির চেয়ারম্যান দাবি করেন বলে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদকারী ঢাকা মহানগর পু’লিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন। হারুন অর রশিদ গতকাল বলেন, তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে সাবরিনাকে

জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়েছে। এরই মধ্যে তিনি কিভাবে প্র’তারণার ফাঁ’দ পেতে করোনা নমুনা পরীক্ষা ছাড়াই ভু’য়া সনদ দিতেন সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। পু’লিশ ও আ’দালত সূত্রে জানা গেছে, ডা. সাবরিনাকে গতকাল সোমবার সকালে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে চার দিনের রি’মান্ডের আবেদন করে পু’লিশ।

শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম শাহিনুর রহমান তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জাতীয় হৃদেরাগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের রেজিস্টারের দায়িত্ব পালন করে আসা ডা. সাবরিনা জেকেজি হেলথকেয়ারের প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরীর স্ত্রী। সে কারণে সাবরিনা আরিফ চৌধুরী নামেই তিনি পরিচিত।

করো’নাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে জালিয়াতির অ’ভিযোগে এক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে সাবরিনার স্বামী আরিফুল বর্তমানে কারাগারে। জানতে চাইলে ডিসি হারুন অর রশিদ গতকাল বলেন, অতি সম্প্রতি জেকেজির ব্যাপারে বিশদ তদন্ত করতে গিয়েই উঠে আসে ডা. সাবরিনা ও তাঁর প্রতারক স্বামী আরিফ চৌধুরীর নাম।

এরপর গত রবিবার ডা. সাবরিনাকে হৃদেরাগ হাসপাতাল থেকে তাঁর কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর তেজগাঁও থানার এক মামলায় তাঁকে গ্রে’প্তার দেখানো হয়। তিনি বলেন, জেকেজির কোনো ট্রেড লাইসেন্স নেই। এর পরও কিভাবে প্রতিষ্ঠানটি করোনা নমুনা সংগ্রহের অনুমতি পেল তার তদন্ত চলছে। সাবরিনার মোবাইল ফোন চেক করে সাতটি মেসেজ পাওয়া গেছে।

প্রতিটি মেসেজে সাবরিনা বিভিন্ন মানুষকে ফোন করে কখনো জেকেজির চেয়ারম্যান, কখনো সমন্বয়ক আবার কখনো আহ্বায়ক পরিচয় দিয়ে প্র’তারণা করেছেন। তাঁকে সহযোগিতাকারী অনেক প্রভাবশালীর নাম জানা গেছে। তেজগাঁও থানা সূত্র জানিয়েছে, জেকেজির বিরুদ্ধে মোট চা’রটি মা’মলা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি প্র’তারণার এবং আরেকটি থা’নায় হা’মলা, ভা’ঙচুর ও পু’লিশের কাজে বাধা দেওয়ার অ’ভিযোগে করা হয়েছে।

প্রথম মা’মলাটি দা’য়ের করেন কামাল হোসেন নামে এক ভু’ক্তভোগী। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে প্র’তারণার মাধ্যমে টাকা আ’ত্মসাৎ, করো’নাভাইরাস প’রীক্ষার ভু’য়া প্র’তিবেদন দেওয়া ও জীবন বি’পন্নকারী রো’গের সং’ক্রমণের মধ্যে দা’য়িত্বে অ’বহেলার অ’ভিযোগ আনা হয় এজাহারে। ওই মা’মলায় গত ২৩ জুন আরিফুলকে গ্রে’প্তারের পর জেকেজি কর্মীরা তেজগাঁও থানায় গিয়ে বি’ক্ষোভ করে।

পরে পু’লিশ বা’দী হয়ে আরেকটি মা’মলা করে এবং তাতে জেকেজির ১৮ কর্মীকে গ্রে’প্তার করা হয়। আ’রিফের গ্রে’প্তারের খবর পেয়ে দুজন ব্যবসায়ী একই থানায় আরো দুটি মা’মলা করেন। এর একটিতে ১২টি ল্যাপটপ ভাড়া নেওয়ার নামে আ’ত্মসাৎ করা এবং অন্যটিতে দুটি আর্চওয়ে এবং ২০টি ওয়াকিটকি কিনে টাকা না দেওয়ার অ’ভিযোগ আনা হয়।

এর মধ্যে আরিফকে তিনটি প্র’তারণার মা’মলায় গ্রে’প্তার দেখানো হয়েছে। আর সা’বরিনাকে গ্রে’প্তার দেখানো হয়েছে প্রথম মা’মলায়। পু’লিশ জানিয়েছে, তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে প্র’তারণার বাকি দুই মা’মলায়ও তাঁকে গ্রে’প্তার করা হতে পারে। এর আগে রাজধানীর কল্যাণপুরের একটি বাড়ির ত’ত্ত্বাবধায়কের অ’ভিযোগের সত্যতা পেয়ে গত ২২ জুন জেকেজি হেলথকেয়ারের

সাবেক গ্রাফিক্স ডিজাইনার হুমায়ন কবির হিরু ও তাঁর স্ত্রী তানজীন পাটোয়ারীকে গ্রে’প্তার করে পু’লিশ। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে প্রতিষ্ঠানটির সিইও আরিফুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। মা’মলার বাদী কামালের অভিযোগ, তাঁর বাড়ির মালিক ও স্ত্রীর জ্বর, সর্দি হওয়ায় কভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য অনলাইনের মাধ্যমে জেকেজির পক্ষে হুমায়ুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

তাঁরা দুজন ছাড়াও তাঁদের ছেলে, গাড়িচালক, গৃহপরিচারিকার নমুনা তিন দফায় বিজয় সরনি মোড়ে হুমায়ুনের লোক এসে নিয়ে যায়। এ জন্য ৪৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের দিনই জাতীয় হৃদেরাগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে ডা. সাবরিনাকে বরখাস্ত করার অফিস আদেশ জারি করা হয়। এর ঘণ্টাখানেক পর সরকারি কর্মচারী বিধিমালা ভঙ্গের অ’ভিযোগে তাঁকে সাময়িক ব’রখাস্ত করার কথা জানায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ওই আদেশে বলা হয়, ডা. সাবরিনা শারমিন

হুসাইন সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেকেজির চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি করোনা টেস্টের ভু’য়া রি’পোর্ট দেওয়া এবং অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। নতুন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর নমুনা পরীক্ষার জন্য জেকেজিকে দায়িত্ব দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তখন এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে ডা. সাবরিনার কথাই বলা হতো। কিন্তু জুনের শেষ দিকে জেকেজির দুর্নী’তির খবর প্রকাশ পাওয়ার পর সাবরিনা দাবি করেন, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গত দুই মাস ধরে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই।

পু’লিশের তদন্তে উঠে এসেছে, ঢাকার তিতুমীর কলেজ মাঠে প্রথমে স্যাম্পল কালেকশন বুথ স্থাপনের অ’নুমতি মিললেও প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার অন্য এলাকাসহ আরো অনেক জেলা থেকেও নমুনা সংগ্রহ করে জেকেজি। জেকেজির গুলশান কার্যালয়ে গত ২৪ জুন অ’ভিযান চালিয়ে আরিফসহ ছয়জনকে গ্রে’প্তার করে তাঁদের দুই দিনের রি’মান্ডে নেওয়া হয়। তাঁরা এ বিষয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

সা’বরিনার প্র’তারণার শেষ নেই জানিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে তিনি এক রোগীর নামে নি’বন্ধিত মোবাইল সিম ব্যবহার করে সেটি প্র’তারণার কাজে ব্যবহার করে আসছিলেন। রি’মান্ডে জানতে চাইলে সাবরিনার দাবি, ওই সিম কার নামে নিবন্ধিত তা তিনি জানতেন না। তবে পুলিশ বলছে, অন্যের নামে নি’বন্ধিত সিম ব্যবহার করা বড় ধরনের অ’পরাধ। কারণ এই সিম ব্যবহার করে বড় ধরনের অ’পরাধ করে তার দায় অন্যের ওপর চাপানো যায়।

বিষয়টি যাচাই করতে সাবরিনার গাড়ির চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে পেরেছে, প্রায় এক বছর ধরে সাবরিনা এই সিম ব্যবহার করছেন। জালিয়াতির মামলায় গ্রেপ্তার আরিফুলের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রিমান্ডে সাবরিনা দাবি করেন, দুই মাস আগে তাঁদের তালাক হয়ে গেছে। পু’লিশ জানায়, জেকেজি হেলথকেয়ার থেকে এখন পর্যন্ত ২৭ হাজার রোগীকে করো’নাভাইরাস পরীক্ষার প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৫৪০ জনের নমুনা আইইডিসিআরের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো হয়েছিল। বাকি ১৫ হাজার ৪৬০টি প্রতিবেদন তৈরি করা হয় জেকেজি কর্মীদের ল্যাপটপে।

ডা. সাবরিনা ও আরিফুলের ব্যাংক হিসাব জব্দ: জেকেজি হেলথকেয়ার ও ওভাল গ্রুপের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা শারমিন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল চৌধুরী এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সব ব্যাংক হিসাব ৩০ দিনের জন্য জব্দ করেছে দেশের কেন্দ্রীয় আর্থিক গোয়ন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সেই সঙ্গে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে এসংক্রান্ত তথ্য বিএফআইইউতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার বিএফআইইউ থেকে এসংক্রান্ত চিঠি দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে।

জেকেজি ও রিজেন্টের প্র’তারণার বিষয় অনুসন্ধান করবে দুদক: ডা. সাবরিনা চৌধুরীর বিরুদ্ধে জাতীয় হৃদেরাগ ইনস্টিটিউটে সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক হিসেবে বহাল থেকে তাঁর স্বামী আরিফ চৌধুরীর সহায়তায় প্র’তারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে করোনা রোগীদের নমুনা সংগ্রহের নামে ১৫ হাজার ৪৬০টি ভুয়া মেডিক্যাল রিপোর্ট তৈরি করে সরবরাহ এবং এর মাধ্যমে আট কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ অ’বৈধ সম্পদ অর্জনের অ’ভিযোগ অ’নুসন্ধান করবে দুদক। গতকাল এক চিঠিতে দুদক এ তথ্য জানিয়েছে।

রি’জেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিষয়ও অনুসন্ধান করবে দুদক। সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ—মাইক্রোক্রেডিট ও এমএলএম ব্যবসার নামে জনসাধারণের সঙ্গে প্র’তারণা করে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ, একাধিক জাল-জা’লিয়াতি ও প্র’তারণার মাধ্যমে পরস্পর যোগসাজশে সরকারি অর্থ আ’ত্মসাৎ, আ’য়কর ফাঁকি, ভু’য়া নাম ও পরিচয়ে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করে কোটি কোটি টাকা আ’ত্মসাতের মাধ্যমে অ’বৈধ সম্পদ অর্জনের অ’ভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে অ’নুসন্ধানের জন্য দুদকের উপপরিচালক আবু বকর সিদ্দিকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের দল গঠন করা হয়েছে। দলের অন্য সদস্যরা হলেন নেয়ামুল হাসান গাজী ও শেখ গোলাম মাওলা। সূত্র: কালেরকণ্ঠ