সরানো হলো বিতর্কিত ওয়েব সিরিজ; তাতেই সমাধান?

রবিবার, জুন ২১, ২০২০ ৭:৪৭ পূর্বাহ্ণ

গেল ঈদে উন্মুক্ত হওয়া তিনটি ওয়েব সিরিজকে ঘিরে চলছে তুমুল বিতর্ক। বিঞ্জ অ্যাপের প্রযোজনায় নির্মিত এই তিনটি সিরিজের মধ্যে রয়েছে ‘আগষ্ট ১৪’, ‘সদরঘাটের টাইগার’ ও ‘বুমেরাং’। নির্মাণ করেছেন দেশের অন্যতম প্রশংসিত তিন নির্মাতা শিহাব শাহীন, সুমন আনোয়ার ও ওয়াহিদ তারেক।

এই অ্যাপে আরও অনেক কনটেন্ট প্রকাশ পেলেও আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে এই তিনটি সিরিজ। মূল অভিযোগ অশ্লীলতা। যার দায়ে দেশের অনেক নির্মাতা-প্রযোজক-শিল্পী দাবি তুলেছেন ওয়েব সিরিজের নামে এসব বন্ধ করা হোক। আবার কেউ বলছেন এটা বৈশ্বিক ডিজিটাল বিনোদনের অন্যতম দাবি। ফলে এটাকে বাদ দেওয়া মানে নিজেদের পিছিয়ে রাখা।

মূলত এসব বিতর্কে অ্যাকটিং মিডিয়া এখন এতটাই উত্তপ্ত, যেখানে করোনা, মহামারি, শুটিংয়ে ফেরা না ফেরা বা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তেমন কোনও আলাপের সুযোগ নেই! সবার মুখে একটাই আলাপ—ওয়েব সিরিজ।

মজার ব্যাপার হলো এই ওয়েব সিরিজগুলো কয়জনে দেখেছেন? প্রশ্ন হলো পরিচালকদের। যেমন শিহাব শাহিন জানালেন, ‘১৪ আগস্ট পাইরেসি হয়ে যায়। সেই পাইরেসি কপিই সবাই দেখছে। সেখান থেকেই নানা কথা। কিন্তু বিঞ্জ অ্যাপে গিয়ে দেখবেন যেমনটা নিয়ে অভিযোগ এমন কিছুই নেই। ’ আর সেজন্যই নাকি শিহাব শাহিনের ‘১৪ আগস্ট’ এখনো রয়ে গেছে এই অ্যাপে। আলোচনায় থাকা অন্য দুইটি ‘সদরঘাটের টাইগার’ ও ‘বুমেরাং’ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গত ১৪ জুন আদালত থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে থাকা সিনেমা এবং ওয়েব সিরিজের আপত্তিকর দৃশ্য সরিয়ে ফেলতে ২৪ ঘণ্টার সময় দিয়ে সংশ্লিষ্টদের আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয় সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সচিব, বিটিআরসি’র চেয়ারম্যান ও পরিচালক, পুলিশের আইজি এবং সিআইডি’র সাইবার পুলিশ ব্যুরোর অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক ডিআইজি’র ইমেইলে এ নোটিশ পাঠানো হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানভীর আহমেদ এ নোটিশ পাঠিয়েছেন। ঠিক পরের দিনই সরিয়ে নেওয়া হয় এই দুটি ওয়েব সিরিজ।

সরিয়ে নেওয়ার কারণ বলতে ওয়াহিদ তারেক ও সুমন আনোয়ারের মত প্রায় একই। তারা বলেন, সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষর। আমরা পরিচালক হিসেবে গল্প বলেছি। সেই গল্পে আনুষঙ্গিক যা সেটাই আনার চেষ্টা করেছি।

তারা বলেন, ‘এসব সিরিজে নাকি আপত্তিকর দৃশ্য দেখা গেছে। তাই এসব ভিডিও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, ২০১৮ এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। যা কিনা আমাদের দেশের সংস্কৃতি এবং সামাজিক নিয়মশৃঙ্খলার জন্যও হুমকিস্বরূপ। এখানে প্রশ্ন রাখতে হবে এমন কনটেন্ট বাংলাদেশে কি আর দেখা যায় না? আমরা বিদেশি সিরিজগুলো এখানে অবাধে চলতে দিচ্ছি। তার তো কোন বিধি নিষেধ নেই। আমরা বাধাগ্রস্থ হচ্ছি। আমরা গল্বের প্রয়োজনেই যতটা করতে হয়েছে তা করেছি। যারা এটাকে অশ্লীল এই সেই বলছে। তারাই কিন্তু স্যাক্রেড গেমসসহ আরো অনেক ভারতীয় সিরিজ ফেসবুকে জানান দিয়ে দেখেন। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে আসলে আমাদের অনেক কিছুই ভাবতে হবে। সারা বিশ্বের মানুষ কি দেখছে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা কি দেখবো সেটা ভাবতে হবে।’

বরেণ্য নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম বলেন, ‘সরানোটাই সমাধান না। এর জন্য আসলে আমাদের নীতি নির্ধারকদের ভাবতে হবে। এটা কিন্তু একটা বড় মার্কেট ইতিমধ্যে তৈরী হয়েছে। আমরা সেখানে কি করছি সেটা কিন্তু ভাববার সময় এসেছে। চলমান ওয়েব সিরিজ বিতর্কের আলোকে প্রশ্ন– খোলামেলা দৃশ্য বা গালাগালি বা ভায়োলেন্স, এমন দৃশ্য না দেখালেই কি, বা দেখালেই কি থাকবে? বিশ্বের অনেক দেশেই ওয়েব কন্টেন্টের শুরুর সময় এরকম বিতর্ক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। তেমনি তার আলোকে আমরা বলতে পারি, দর্শক ও বিনোদনের সব মাধ্যমের অংশীজনেরা আস্তে আস্তে তাদের দেশের উপযোগী একটি আধুনিক নীতিমালা করবার কারণে পৃথিবীব্যাপী ওয়েব সিরিজ নামক এই নতুন বিনোদনমাধ্যম ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আমি এই একটা দুইটা সিরিজে কি চললো আর কি না চললো সেটা নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে চাই না। আমি সিস্টেম নিয়ে কথা বলতে চাই। ওয়েবের জন্য একটা রুলস করা দরকার। বাইরের দেশগুলো বিশেষ করে ভারতে এই ওয়েবের জন্য অনেক কাজ বেড়েছে। বাজারও প্রসারিত হয়েছে। সেখানে আমি বলবো, আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ নিয়েই আমাদের কন্টেন্ট নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু যেই কন্টেন্টটি যেই প্ল্যাটফর্মের জন্য নির্মিত সেটি সেই দর্শক শ্রেণির কাছে পরিবেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের দর্শকেরা যেহেতু পৃথিবীর প্রায় সব দেশের বিখ্যাত সব সিরিজ দেখছে, কাজেই দেশীয় কন্টেন্ট বলে এর বৈচিত্র্য ও বিষয়বস্তুতে আগেই এটা কি রকম হওয়া উচিত এ নিয়ে এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া উচিত হবে না।’সূত্র:বাংলা ইনসাইডার