মিন্নির গো*পন ভিডিও ভাইরাল

বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৮, ২০১৯ ১১:৫৬ পূর্বাহ্ণ

খু’নি নয়নের সঙ্গে ‘মিন্নির অন্তরঙ্গ মুহূর্তের গো’পন ভিডিও দেখু’ন’। এমন শিরোনামে ফেসবুক ইনবক্সে মেসেজ ঘুরছে। সাথে একটি ঝাপসা ছবি। সেখানে যুবকের সাথে তরুণীকে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে দেখা যায়। বলা হচ্ছে, ঝাপসা ওই যুবতীই মিন্নি। যুবক তার স্বামী রিফাত শরীফের খু’নি নয়ন বন্ড। স্বামীর খু’নির সাথে মিন্নির ‘অ’বৈধ অন্তরঙ্গ ভিডিও’ ছড়িয়ে তার ফাঁ’সি চাচ্ছে একদল জনতা। কেন? তারা কারা? সদ্য স্বামী হা’রানো তরুণীর নামে এমন ভিডিও ছড়ানোর কারণটা কী?

সাদা চোখে কিংবা ফাঁ’সির দাবি জানানো জনতার মতে, মিন্নি এক ‘চরিত্রহীনা’ নারী। একই সাথে রিফাত আর নয়নের ‘ঘর করেছে’ সে। নয়ন বন্ডের সাথে ‘বিয়ে’র কথা গো’পন করে রিফাত শরীফকে বিয়ে করেছে। তারপর দু’জনকে ‘বাহুডোরে বেঁধে’ ভাসতে চেয়েছে অন্যায় আনন্দে। দুই নৌকায় পা’ দিয়ে চলা এই ‘দ্বিচারিণী’র কারণেই লা’শ হলো রিফাত ও নয়ন। মিন্নি কেন ডুববে না? তাকেও ডুবতে হবে। পরতে হবে ফাঁ’সির দড়ি। ‘চরিত্রহীনা’ মিন্নিকে ‘শিক্ষে’ দেয়া গেলে ‘রক্ষে’ পাবে আমাদের সাধু সমাজ।

‘মিন্নির গো’পন ভিডিও’ বস্তুত সমাজের প্রকাশ্য ব্যাধি। যে ব্যাধির শিরায় শিরায় বয়ে চলে ধ’র্ষণের জীবাণু। যে ব্যাধি চুপি চুপি বলে যায় আমাদের নীতিনৈতিকতা, মানবিকতা, রুচি ও চরিত্র স্থলনের গল্প। চরিত্রের চূড়ান্ত পতন না হলে একজন মৃ’ত মানুষের নামে পর্ণ ভিডিও ছড়ায় কোন সমাজ? যুক্তি ও বিবেক চূড়ান্ত বিসর্জন দিলেই খু’নির বিচারের দাবির চে’ মুখ্য হয়ে ওঠে ‘গো’পন ভিডিও’। স্বামীহারা নারীর চরিত্র বিশ্লেষণ। আর ফাঁ’সি চাওয়া যায় স্বামীকে বাঁ’চাতে অ’স্ত্রের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়া নারীটির।

সমাজের একটা বড় অংশ মিন্নিকে চরিত্রহীনা প্রমাণ করতে ব্যস্ত। খু’ন ও খু’নিদের বিচারের চেয়ে তাদের আগ্রহের কেন্দ্রে ‘গো’পন ভিডিও’। এর নানাবিধ কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, নারী-পুরুষের প্রেম এমনকি বন্ধুত্বকেও আমাদের সমাজ স্বাভাবিকভাবে দেখতে শেখেনি। এখানে প্রকাশ্য দিবালোকে দু’জন তরুণ-তরুণী পাশাপাশি বসলেও আ’টক হয়ে যায়। এখানে নারীর প্রতি মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলে ‘উচ্চশিক্ষিত’ তরুণরাও। নারী মানেই মাংস ও ভোগ্যা। সে ঘরের বাইরে গেলেই যেন ‘বেশ্যা’।

কিন্তু এই যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা পরিবর্তন হচ্ছে না কেন? তরুণ-তরুণীরা কেন নারী-পুরুষের স’ম্পর্ককে স্বাভাবিক চোখে দেখতে শিখছে না? মানুষের জীবনে প্রেম আসতে পারে, প্রেম ভাঙতে পারে। এই স্বাভাবিক ব্যাপারকে তারা কেন মানতে শিখছে না? প্রিয় মানুষটির পছন্দের সঙ্গীকে সম্মান করার স্বাভাবিক মানসিকতা গড়ে উঠছে না কেন? জীবনে এসব জটিলতার মুখোমুখি কম বেশি সবাইকেই হতে হয়, কিভাবে এগুলোর মুখোমুখি হতে হয়, মনকে মানাতে হয়, সে শিক্ষা কি তারা পাচ্ছে? পাচ্ছে না। এই শিক্ষাহীনতাই নারীর প্রতি অস্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান কারণ। তাই শুধু ভালো রেজাল্ট নয়, সময় এসেছে শিক্ষার্থীদের মানসিকতা ও মানবিকতা বিকাশের দিকে নজর দেয়ার। তা না হলে যতই উন্নয়নের মেইলট্রেন ছুটুক, যুক্তিবিবর্জিত মস্তিষ্কে আবেগের বোঝা নিয়ে আম’রা পড়ে রবো ‘গো’পন ভিডিওর’ অন্ধ প্রকোষ্ঠে। আর ছুটে বেড়াবো খু’নের মুখ্য অ’প’রাধ এড়িয়ে গৌণ ‘চরিত্র’ বিশেষণেই।

আম’রা কিছুতেই বুঝতে পারবো না যে, নয়ন বন্ডের সাথে মিন্নির যদি অ’বৈধ স’ম্পর্ক থেকেও থাকে তাতে কিছুই আসে-যায় না। প্রকাশ্য দিবালোকে নৃ’শংস খু’নের পর পর’কীয়া, প্রেম কিংবা কোনো ভিডিওই মুখ্য থাকে না। ‘দ্বিচারিণী’ মিন্নি তখন গৌণ হয়ে যায়। ফোকাস দিতে হয় শুধুই ঘৃণ্য হ’ত্যাকা’ণ্ডে। তা না হলে দুর্বল বিচারব্যবস্থায় আইনের ফাঁকগলে মূল অ’প’রাধীরা চলে যেতে পারে আড়ালে।

রিফাত হ’ত্যার মূল আ’সামি নয়ন বন্ড ‘ব’ন্দুকযু’দ্ধে’ খতম হয়েছে। রিফাত শরীফকে কোপানো আরেক আ’সামি রিফাত ফরাজীকে গ্রে’ফতার করেছে পু’লিশ। চলছে জিজ্ঞাসাবাদ। কিন্তু অনেক আ’সামিই এখনও আ’টক হয়নি, যারা হ’ত্যাকা’ণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিল। অথচ এরই মধ্যে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে রিফাতের স্ত্রী’ মিন্নিকে। একদল জনতা তাতে আনন্দ প্রকাশ করছে। এরা নয়ন বন্ড ‘ব’ন্দুক যু’দ্ধে’ নি’হত হলেও আনন্দিত হয়েছিল। অ’প’রাধী সাজা পেলে মানুষ খুশি হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অ’প’রাধী বিনা বিচারে ‘খতম’ হলে জনতা যদি খুশি হয় সেটি ভয়ঙ্কর। তখন বুঝতে হয় রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার প্রতি তারা আস্থা হারিয়েছে।

আর যে রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা জনতার আস্থা হারায়, সে রাষ্ট্র ‘ভয়ঙ্কর’। মনে রাখা দরকার সেখানে ক্রমাগত অ’প’রাধ বেড়েই চলে। যে রাষ্ট্র ‘অ’প’রাধী’কে ‘ব’ন্দুক যু’দ্ধে খতম’ করে, সে রাষ্ট্রের ব’ন্দুক তাক হতে পারে নিরপরাধীর মস্তকেও। সুতরাং, সাধু সাবধান! ‘গো’পন ভিডিও’র বদলে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা অন্যায়-অনিয়ম, অ’প’রাধের সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে দাঁড়ান।