ঘুমন্ত বাবাকে হ’ত্যা করেও দেশবাসীর মন জিতেছেন এই তিন বোন!

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২২, ২০১৯ ১২:১৪ অপরাহ্ণ

২০১৮ সালের জুলাইয়ে রাশিয়ার তিন কিশোরী বোন মিলে ঘুমন্ত বাবাকে হ’ত্যা করেছিলেন। অথচ তাদের মুক্তির দাবিতে ইতোমধ্যে তিন লাখের বেশি মানুষ পিটিশনে সইও করে ফেলেছে।

কেননা তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, বাবার হাতে বহু বছর ধরে শারীরিক ও মানসিক নি’র্যা’তনের শিকার হচ্ছিলেন হ’ত্যার দায়ে অভিযুক্ত এই তিন বোন। মস্কোতে এক ফ্ল্যাটে মেয়ে ক্রেস্টিনা (১৯), অ্যাঞ্জেলিনা (১৮) এবং মারিয়ার (১৭) সঙ্গে বসবাস করতেন ৫৭ বছর বয়সী বাবা মিখাইল খাচাতুরইয়ান।

২০১৮ সালের ২৭ জুলাই সন্ধ্যায় মিখাইল একে একে তিনজনকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠান। ঘরবাড়ি ঠিকঠাক পরিষ্কার না করার জন্য তিনজনের সঙ্গেই তিনি ভীষণ রা’গারা’গি করেন। এমনকি তাদের মধ্যে পিপার গ্যাসও স্প্রে করেন শা’স্তি হিসেবে।

এর কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে যান মিখাইল। আর তখনই তিন মেয়ে একটি ছু’রি, হা’তু’ড়ি এবং পিপার স্প্রে নিয়ে ঝাঁ’পিয়ে পড়েন ঘুমন্ত বাবার ওপর। সব আ’ক্রো’শ ঝেড়ে হিং’স্রভাবে আ’ঘা’ত করে হ’ত্যা করেন বাবাকে। মিখাইলের দেহে ৩০টিরও বেশি ছু’রি’কা’ঘা’তের ক্ষ’ত পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে মা’রা’ত্ম’ক আ’ঘা’ত ছিল মাথা, ঘাড় ও বুকে। বাবাকে নৃ’শং’সভাবে হ’ত্যার পর তিন বোন মিলে পুলিশকে ফোন করেন এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর আত্মসমর্পণ করেন। ক্রেস্টিনা, অ্যাঞ্জেলিনা ও মারিয়াকে গ্রে’প্তারের পর শুরু হয় মামলার তদন্ত।

এর মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে খাচাতুরইয়ান পরিবারে চলে আসা ভ’য়া’বহ নি’র্যা’ত’ন ও নি’পী’ড়নের ইতিহাস। তদন্ত কর্মকর্তারা জানতে পারেন, টানা তিন বছরের বেশি সময় ধরে বাবা মিখাইল খাচাতুরইয়ান নিয়মিত মেয়েদেরকে মা’রধ’র ও নানাভাবে নি’র্যা’তন করতেন।

তাদেরকে ঘরে আটকে রাখতেন তিনি। এমনকি নিজের তিন মেয়েকে যৌ’ন নি’পী’ড়নও করতেন মিখাইল। হ’ত্যা মামলার অভিযোগপত্রে বাবার বিরু’দ্ধে পাওয়া এই প্রমাণগুলো যুক্ত করা হয়েছে। তিন বোনের মানসিক অবস্থা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তিনজন মেয়েকে লোকজনের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা হতো।

ফ্ল্যাটের ভেতর আ’ট’ক অবস্থায় প্রতিনিয়ত নি’পী’ড়নের শিকার হতে হতে তাদের মধ্যে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস সিনড্রোম (পিটিএসডি) দেখা দিয়েছিল। ঘটনার প্রথম থেকেই মামলাটি পুরো রাশিয়ায় সাড়া ফেলে দিয়েছিল। এসব তথ্য প্রকাশের পর মানবাধিকার কর্মীরাও মেয়েদের পক্ষে লেগে যান।

তারা যুক্তি দেখান, এই তিন বোন অ’প’রা’ধী নন, বরং অ’প’রা’ধের শিকার। নি’পী’ড়ক বাবার কাছ থেকে রেহাই পাবার কোনো উপায় না পেয়ে বছরের পর বছর নি’র্যা’তন সইছিলেন তারা। রাশিয়ায় এখনো পারিবারিক স’হিং’সতার শি’কার ব্যক্তিকে রক্ষা করার জন্য কোনো আইন নেই।

২০১৭ সালে আনা নতুন কিছু আইনি পরিবর্তন অনুসারে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি প্রথমবারের মতো পরিবারের কোনো সদস্যকে আ’ঘা’তের অভিযোগ আনা হয়, আর সেই আ’ঘা’ত যদি হাসপাতালে ভর্তি করার মতো গু’রু’তর না হয়, তবে তাকে শুধু সামান্য কিছু অর্থ জ’রিমা’না করা হবে অথবা সর্বোচ্চ দু’সপ্তাহ জেল হা’জ’তে রাখা হবে।

বিবিসি জানায়, রুশ পুলিশ সাধারণত পারিবারিক নি’র্যা’ত’নের ঘটনাগুলোকে ‘পারিবারিক বিষয়’ হিসেবে ধরে নেয় এবং নি’র্যা’ত’নের শিকার ব্যক্তির তেমন কোনো কাজেই আসে না। মিখাইল তার স্ত্রীর ওপরও একইভাবে নির্মম নি’র্যা’তন চালাতেন।

নি’র্যা’তনে অতি’ষ্ঠ হয়ে অরেলিয়া ডুনডুক পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন। তাকে বাঁচাতে প্রতিবেশীরাও গিয়েছিলেন পুলিশের কাছে সাহায্য চাইতে। তারাও মিখাইলকে খুব ভয় পেতেন। কিন্তু কোনোবারই পুলিশ তাদেরকে কোনো সাহায্য করেনি।

২০১৫ সালে অরেলিয়াকে মিখাইল বাসা থেকে বের করে দেন। তারপর থেকে মেয়েদের সঙ্গে চেষ্টা করেও আর যোগাযোগ করতে পারেননি অরেলিয়া। মেয়েদের সঙ্গে সবরকম সম্পর্ক রাখা তার জন্য নি’ষি’দ্ধ ছিল।

মামলার অগ্রগতি বেশ ধীরে চলছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো। ক্রেস্টিনা, অ্যাঞ্জেলিনা ও মারিয়া এখন আর পুলিশি হেফাজতে না থাকলেও তাদের ওপর বেশ কিছু নি’ষে’ধা’জ্ঞা রয়েছে: তারা সাংবাদিক বা একে অপরের সঙ্গে কোনো কথা বলতে পারেন না।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করছেন, হ’ত্যাকা’ণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল। তাদের যুক্তি, তিন বোন সকালেই ছু’রিটি লুকিয়ে রেখেছিলেন। বাবা ঘুমিয়ে পড়ার পর তিনজন মিলে পরিকল্পনা অনুযায়ী হ’ত্যাকাণ্ডটি চালান। হ’ত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য প্র’তি’শোধ নেয়া ছিল বলে তাদের দাবি।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, অ্যাঞ্জেলিনা হা’তুড়ি, মারিয়া ছু’রি এবং ক্রেস্টিনা পিপার স্প্রে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হা’ম’লা চালিয়েছিলেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিন বোনকে সর্বোচ্চ ২০ বছরের কা’রাদ’ণ্ড ভোগ করতে হতে পারে। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলছেন, হ’ত্যা’কাণ্ডটি মূলত আ’ত্মর’ক্ষা’র্থে ঘটানো হয়েছে।

রাশিয়ার দণ্ডবিধিতে শুধু তাৎক্ষণিক স’হিং’সতার ক্ষেত্রে আ’ত্ম’র’ক্ষা নয়, টানা নি’র্যা’তন বা অ’প’রা’ধের শিকারের ক্ষেত্রেও পাল্টা হা’ম’লাকে আ’ত্ম’র’ক্ষা হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জিম্মি অবস্থায় নি’র্যা’ত’নের শিকার ব্যক্তি নি’র্যা’ত’নকারীকে হ’ত্যা করলে সেটি ‘আ’ত্মর’ক্ষা’র্থে হ’ত্যা’।

আর এই আইনের পরিপ্রেক্ষিতেই তিন বোনের আইনজীবী দাবি করছেন, বছরের পর বছর টানা অ’পরা’ধের শিকার হয়ে এ কাজ করেছেন তারা। তাই তাদেরকে মুক্তি দেয়া উচিত। তিনি আশা করছেন, মামলাটি শিগগিরই খারিজ করে দেয়া হবে।

কেননা ইতোমধ্যে ক্রেস্টিনা, অ্যাঞ্জেলিনা ও মারিয়ার ওপর অন্তত ২০১৪ সাল থেকে বাবা মিখাইলের নি’র্যা’তন-নি’পী’ড়নের প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। মানবাধিকার কর্মীসহ রাশিয়ার অধিকাংশ সাধারণ জনগণও এখন আইনের পরিবর্তন চান।

এছাড়া নি’র্যা’তিত ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাও চান তারা। আর এখন সবাই দেখার অপেক্ষায় আছেন, শেষ পর্যন্ত কী ঘটে এই তিন বোনের ভাগ্যে। সূত্র : মস্কো টাইমস