করোনা নিয়ে সব জোত্যিষীই ভুল?

বুধবার, জুন ২৪, ২০২০ ৩:২৯ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের সময় অনেক জোত্যিষী তৈরি হয়েছে, আমরা তাঁদেরকে বিশেষজ্ঞ বলতে চাইনা। কারণ বিশেষজ্ঞরা কথা বলেন বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ দ্বারা। কিন্ত আমাদের বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের সময় এমন সব ব্যক্তিরা বিভিন্ন সব কথাবার্তা বলছেন যাদের এই বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতাই নেই, বিশেষজ্ঞ হওয়া তো দূরের কথা।

তারাই এখন করোনার সময়ে পণ্ডিত হয়েছেন এবং তাঁরা যে কথাগুলো বলছেন সেই সমস্ত কথাগুলো ঠিক যেন জোত্যিষীদের ভাগ্য গণনার মতোই। এমন অনেকেই করোনা নিয়ে বক্তব্য রাখছেন যারা করোনা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তো ননই, অনেকে চিকিৎসক হলেও অন্য ঘরানার। পেশাগত দায়িত্বও তারা পালন করেন না।

যেমন (ড্যাব) মহাসচিব ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। আবার অনেকে রাজনৈতিক কারণেও বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন যেমন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কিংবা সিনিয়র যুগ্ন মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তারা করোনা নিয়ে মানুষকে নানা রকম উপদেশ দিচ্ছেন এবং ভবিষ্যৎবাণী করছেন। ঠিক যেন তারা জোত্যিষী।

আর এই জোত্যিষী শাস্ত্রে নেতৃত্ব দেওয়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখন জনগণের স্বাস্থ্য-সুরক্ষা নিশ্চিতের পরিবর্তে জোত্যিষ শাস্ত্রের দিকে মনযোগী। শুরু থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একের পর এক ভবিষ্যৎবাণী করছে যেগুলো করোনা সঙ্কটের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু কৌতুকের খোঁড়াক দিচ্ছে। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একা নয়, করোনা সঙ্কটের এই সময়ে আরো কিছু জোত্যিষীর উদ্ভব হয়েছে যারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম ভবিষ্যৎবাণী করছেন। বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে কিছু আলোচিত ভবিষ্যৎবাণীর দিকে যদি আমরা দৃষ্টি দেই-

১. বাংলাদেশে করোনার ব্যাপক বিস্তৃতি হবেনা

করোনা সংক্রমণের শুরুতেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছিলেন যে, নানা কারণে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের ব্যাপক বিস্তৃতি হবেনা। তিনি বলেছিলেন যে, বাংলাদেশ তরুণ প্রধান দেশ এবং আবহাওয়া ও নানাবিদ বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করবে না- এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, করোনা মোকাবেলায় কোন প্রস্তুতি দরকার নেই। কিন্তু পরে এই বক্তব্য যে ভুল প্রমাণ হয়েছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

২. সাধারণ ছুটি তুলে দেওয়ার পর ব্যাপক সংক্রমণ হবে

করোনা নিয়ে দ্বিতীয় যে ভবিষ্যৎবাণীটি করা হয়েছিল তা হলো সাধারণ ছুটি তুলে দেওয়ার পর ব্যাপক সংক্রমণ হবে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে বাংলাদেশে করোনার ব্যাপক সংক্রমণ হয়েছে কিছু এলাকাব্যাপী। বাকি এলাকায় করোনা সংক্রমিত হলেও তা ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি পায়নি বা ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি। শুধুমাত্র ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের মতো এলাকাগুলোতে দেশের মোট সংক্রমণের ৭০ ভাগ বিস্তৃত হয়েছে। একারণে সাধারণ ছুটি তুলে নিলে সারাদেশে করোনা ছড়িয়ে পড়বে- এই ভবিষ্যবানীও টিকলো না।

৩. লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে করোনা

বাংলাদেশে অনেক করোনা বিশেষজ্ঞ (জোতিষ্যী) মন্তব্য করেছিলেন যে, এখন বাংলাদেশে করোনা শনাক্তের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। অর্থাৎ ২ হাজার থেকে ৩ হাজার, সেখান থেকে ৪ হাজার এভাবে বাড়তে থাকবে। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে বিদেশি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গণমাধ্যম বাংলাদেশে ৭ লাখ করোনা রোগী আছে বা ১ কোটি করোনা আক্রান্ত হবে এরকম প্রক্ষেপণ করেছিল। যদিও এই প্রক্ষেপণগুলোর ভিত্তি কি ছিল তা জানা যায়নি।

তবে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে করোনা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে না। বরং গত সপ্তাহ ধরে ৩ হাজারের আশেপাশে করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে। শতকরা হার দেখলে দেখা যাবে যে, ২০ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যেই শনাক্তের হার কয়েক সপ্তাহ যাবত অবস্থান করছে। কাজেই লাফিয়ে লাফিয়ে শনাক্তের হার বাড়ার যে তত্ত্ব, সেই তত্ত্ব সঠিক নয়। এই তত্ত্বের ভিত্তিতে অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন যে, বাংলাদেশ হার্ড ইমিউনিটির দিকে চলে যেতে পারে। সাধারণত ৬০ কিংবা ৭০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হলে সেটাকে হার্ড ইমিউনিটি বলে, তবে সেরকম পরিস্থিতিও হয়নি।

৪. বাংলাদেশে ২-৩ বছর বা তাঁর বেশি সময় করোনা থাকবে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর সিএমএইচ-এ চিকিৎসা নিয়েছিলেন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে তিনি একজন জ্যোতিষীতে পরিণত হন। বাংলাদেশে ২-৩ বছর বা তাঁর বেশি সময় করোনা থাকবে বলে তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেন। এই ভবিষ্যৎবাণী কোথা থেকে পেয়েছিলেন বা কিভাবে পেয়েছিলেন তা কেউ জানেনা। অবশ্য পরবর্তীতে তিনি তাঁর মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন। কিন্তু ভবিষ্যৎবাণী বলে কথা! তাই এই বক্তব্য জাতিকে উদ্বিগ্ন করলো এবং পরে এই জ্যোতিষীর বক্তব্য আমরা যত্ন করে রেখেছি।

৫. মাসে এক লাখ করোনা আক্রান্ত হবে

করোনা নিয়ে সর্বশেষ ভবিষ্যৎবাণীটি করেছেন স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি গতকাল চীনা বিশেষজ্ঞ দলের বিদায়ী অনুষ্ঠানে বলেন যে, যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে বাংলাদেশে প্রতি মাসে ১ লাখ পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হতে পারে। যখন করোনা সংক্রমণের সময় মানুষকে আশ্বস্ত করার কথা, তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেন আতঙ্ক ছড়ানোর কাজ নিয়েছে এবং এই ধরণের আতঙ্ক ছড়িয়ে করোনা কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে সে এক বড় প্রশ্ন। তবে করোনা সঙ্কটে বাংলাদেশের একটি লাভ হয়েছে, জোতিষ্যীদের ভবিষ্যৎবাণীর উপর মানুষের অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে এবং জ্যোতিষশাস্ত্রে অরুচি তৈরি হয়েছে।সূত্র:বাংলা ইনসাইডার